তাজমহলের ইতিহাস: মমতাজ ও শাহজাহানের অমর প্রেমের কাহিনী
তাজমহল শুধুমাত্র একটি স্থাপত্য নয়, বরং এটি মুঘল সম্রাট শাহজাহানের তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের প্রতি অগাধ ভালোবাসার এক চিরন্তন প্রতীক। ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত এই শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরের সমাধিটি বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম।
তাজমহলের ইতিহাসের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. প্রেক্ষাপট ও অনুপ্রেরণা
তাজমহল নির্মাণের পেছনে রয়েছে এক গভীর শোকের ইতিহাস। ১৬৩১ সালে সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী মমতাজ মহল তাঁদের চতুর্দশ সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে সম্রাট গভীরভাবে শোকাহত হয়ে পড়েন। মমতাজের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে শাহজাহান বিশ্বের সবথেকে সুন্দর সমাধি সৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।
২. নির্মাণকাল ও শ্রমিক
তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৩২ সালে। এটি সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছিল প্রায় ২২ বছর। ১৬৫৩ সালের দিকে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তৎকালীন সময়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক নিয়োজিত ছিলেন। শুধু ভারত নয়, পারস্য, অটোমান সাম্রাজ্য এবং ইউরোপ থেকেও দক্ষ কারিগর ও স্থপতিদের নিয়ে আসা হয়েছিল।
৩. স্থাপত্যশৈলী
তাজমহলের নকশা মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে পারস্য, ইসলামি এবং ভারতীয় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণ ঘটেছে।
-
প্রধান স্থপতি: ওস্তাদ আহমেদ লাহোরিকে তাজমহলের প্রধান নকশাকার হিসেবে গণ্য করা হয়।
-
উপকরণ: পুরো সমাধিটি রাজস্থানের মাকরানা থেকে আনা সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২৮ ধরনের মূল্যবান পাথর (যেমন—নীলা, পান্না, কার্নেলিয়ান) এনে দেওয়ালে নকশা করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।
-
পিয়ত্রা দুরা (Pietra Dura): মার্বেল পাথরের ওপর মূল্যবান পাথর বসিয়ে লতাপাতা ও ফুলের যে সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়, তাকে ‘পিয়ত্রা দুরা’ বলা হয়।
৪. গঠন ও প্রাঙ্গণ
তাজমহল একটি বিশাল চত্বরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যার প্রধান অংশগুলো হলো:
-
মূল গম্বুজ: এটি প্রায় ৩৫ মিটার উঁচু।
-
চারটি মিনার: মূল কাঠামোর চার কোণায় চারটি মিনার রয়েছে, যা মূল সমাধিটিকে ভারসাম্য প্রদান করে।
-
বাগান (Charbagh): মুঘল রীতি অনুযায়ী তৈরি এই বাগানে জলাধার ও ঝরনা রয়েছে যা জান্নাতের বা স্বর্গের বাগানের প্রতিফলন হিসেবে ধরা হয়।
-
মসজিদ ও মেহমানখানা: মূল সমাধির দুই পাশে লাল বেলেপাথরের দুটি অভিন্ন ভবন রয়েছে।
৫. বর্তমান গুরুত্ব
১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) তাজমহলকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি ভারতের পর্যটন শিল্পের প্রধান আকর্ষণ এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক এই স্থপত্যটি দেখতে আসেন। সময়ের সাথে সাথে দূষণের কারণে মার্বেলের রঙ কিছুটা হলদেটে হয়ে গেলেও ভারত সরকার এর সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
“তাজমহল হলো সময়ের গালে এক ফোঁটা চোখের জল।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তাজমহল আজ কেবল একটি সমাধি নয়, এটি প্রেম এবং ধৈর্যের এক মহাকাব্য যা শত শত বছর ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে আসছে।










