ঢাকা শহরের মসজিদের ইতিহাস: ইসলামিক ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের মহিমা
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়—এটি এক ঐতিহাসিক শহর, যার প্রতিটি অলিগলি, রাস্তা ও স্থাপনায় ইতিহাসের ছাপ রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে মসজিদ এই শহরের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঢাকা শহরকে অনেকেই বলেন “মসজিদের শহর”, কারণ এখানে ছোট-বড় প্রায় হাজারখানেক মসজিদ রয়েছে—যেগুলোর কিছু মোগল আমলের, কিছু ঔপনিবেশিক যুগের, আবার কিছু আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত। এই প্রবন্ধে আমরা জানব ঢাকার মসজিদের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী, বিখ্যাত মসজিদ ও এর ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে।
ঢাকায় মসজিদ নির্মাণের সূচনা
ঢাকায় ইসলাম প্রচার শুরু হয় আনুমানিক ১৩শ শতকে, সুলতানি আমলে। তবে ঢাকাকে “মসজিদের শহর” হিসেবে পরিচিতি দেয় মোগল যুগ। ১৬০৮ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান যখন ঢাকাকে বাংলার রাজধানী ঘোষণা করেন, তখন থেকেই এখানে মসজিদ নির্মাণের ধারা শুরু হয়। রাজধানী হিসেবে ঢাকা দ্রুত উন্নত হতে থাকে, আর এর সঙ্গে বাড়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সেই সময়ের প্রশাসক, সেনাপতি ও অভিজাত ব্যক্তিরা তাদের এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করেন, যা একদিকে ছিল নামাজ আদায়ের স্থান, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র।
মোগল আমলের মসজিদের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য
ঢাকার মোগল যুগের মসজিদগুলোতে এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী লক্ষ্য করা যায়, যা ইসলামিক শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় নকশার এক মিশ্র রূপ।
-
গম্বুজ: সাধারণত তিনটি বা পাঁচটি গম্বুজ ব্যবহৃত হতো।
-
খিলান ও মিনার: মসজিদের দরজা ও জানালায় অর্ধবৃত্তাকার খিলান এবং ছোট মিনার দেখা যেত।
-
চুন-সুরকি ও ইট: প্রধান নির্মাণ উপকরণ ছিল লাল ইট, চুন ও সুরকি।
-
অলঙ্করণ: দেয়ালজুড়ে ফুল, লতা, জ্যামিতিক নকশা এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্য থাকত।
এই সময়কার মসজিদগুলো কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং শিল্পকলার উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত মসজিদসমূহ
১️⃣ স্টার মসজিদ (আরমানিটোলা)
ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত মসজিদগুলোর একটি হলো স্টার মসজিদ, যা অবস্থিত পুরান ঢাকার আরমানিটোলায়। ধারণা করা হয়, ১৮শ শতকে মির্জা গোলাম পীর এই মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং পরবর্তীতে ব্যবসায়ী আলি জান বেপারি এর সংস্কার করেন।
এই মসজিদের দেয়াল ও গম্বুজে নীল ও সাদা তারার মোজাইক নকশা ব্যবহৃত হয়েছে, তাই একে বলা হয় “তারকেশ্বরী” বা “স্টার মসজিদ”। জাপানি ও চীনা টাইলসের কাজ এই মসজিদকে করেছে অনন্য শিল্পকর্মের নিদর্শন।
২️⃣ সাত গম্বুজ মসজিদ (মোহাম্মদপুর)
মোগল আমলের অন্যতম স্থাপনা সাত গম্বুজ মসজিদ। ১৬৭৯ সালে সুবেদার উমিদ খান এটি নির্মাণ করেন। নামের মতোই এর গম্বুজ সাতটি—তিনটি মূল ভবনের ওপর ও চারটি চার কোণে। চারপাশে বাগান ও পুকুরঘেরা এই মসজিদে মোগল স্থাপত্যের সমৃদ্ধ নিদর্শন পাওয়া যায়।
৩️⃣ খানমোহাম্মদ মসজিদ
পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি ১৭০৪ সালে খান মোহাম্মদ মির্জা নির্মাণ করেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদে টেরাকোটা ও ফুলেল নকশার দৃষ্টিনন্দন কাজ রয়েছে।
৪️⃣ হোসেনী দালান
যদিও এটি শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামবাড়া, তবুও এটি ঢাকার ইসলামিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৭শ শতকে নির্মিত এই স্থাপনাটি এখনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণে ব্যবহৃত হয়।
ব্রিটিশ আমলে মসজিদের পরিবর্তন
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর যখন ব্রিটিশরা সরাসরি শাসন শুরু করে, তখন মোগল পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেক পুরনো মসজিদ অবহেলায় পড়ে যায়। কিন্তু নবাব পরিবার—বিশেষ করে নবাব আব্দুল গনি ও নবাব সলিমুল্লাহ—ঢাকার মুসলমান সমাজে নতুন ধর্মীয় জাগরণ আনেন। তারা নতুন মসজিদ নির্মাণ ও পুরনো মসজিদ সংস্কারে উদ্যোগ নেন।
এই সময়ের মসজিদগুলোয় ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়—
বড় জানালা, উঁচু মিনার, ও সাদা পাথরের অলঙ্করণ।
এভাবেই মসজিদের নকশায় আসে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য।
পাকিস্তান আমলে মসজিদের সম্প্রসারণ
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকায় মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে শহরে নতুন মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই সময়েই নির্মিত হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত মসজিদ —
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ
১৯৬০ সালে নির্মিত এই মসজিদটি ঢাকার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। স্থপতি আব্দুর রশিদ বিশ্বাস এটি নকশা করেন, যা সৌদি আরবের কাবা শরীফের আদলে তৈরি।
এর স্থাপত্যে দেখা যায় সরলতা, বর্গাকৃতি নকশা এবং বিশাল খোলা প্রাঙ্গণ।
এই মসজিদে একসাথে প্রায় ৪০,০০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
বর্তমানে এটি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত এবং ইসলামী সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
আধুনিক ঢাকায় মসজিদ সংস্কৃতি
বর্তমান সময়ে ঢাকায় প্রতিটি এলাকাতেই একাধিক মসজিদ রয়েছে। ছোট মহল্লা মসজিদ থেকে শুরু করে বৃহৎ ইসলামিক কমপ্লেক্স—সবখানেই আধুনিক স্থাপত্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়।
অনেক নতুন মসজিদে এখন সাউন্ড সিস্টেম, এয়ার কন্ডিশন, ডিজিটাল ঘড়ি ও স্বয়ংক্রিয় আলো নিয়ন্ত্রণের সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে শহরে ৬,০০০-এরও বেশি মসজিদ রয়েছে—যা বিশ্বের যে কোনো শহরের তুলনায় অত্যন্ত বেশি।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
ঢাকার মসজিদগুলো শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; এগুলো সমাজের ঐক্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতীক।
-
শুক্রবারে একত্রে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক দৃঢ় হয়।
-
রমজান, ঈদ, মিলাদুন্নবীসহ বিভিন্ন ইসলামী উৎসবে মসজিদ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
-
অনেক মসজিদেই এখন দারুল কুরআন, ইসলামিক স্কুল ও হিফজখানা চালু রয়েছে।
ঐতিহ্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
যদিও ঢাকায় অসংখ্য ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে, তবুও অনেক প্রাচীন স্থাপনা বর্তমানে হুমকির মুখে। নগরায়ন, নির্মাণজট, ও অবহেলার কারণে অনেক মসজিদ হারাচ্ছে তাদের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য।
পুরান ঢাকার কয়েকটি মসজিদে বর্তমানে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই।
ঐতিহ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, গবেষণা, ও স্থানীয় জনগণের সচেতনতা।
উপসংহার
ঢাকা শহরের মসজিদের ইতিহাস শুধু স্থাপত্যের গল্প নয়—এটি আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের ইতিহাস।
ষোড়শ শতকের মোগল আমল থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত, ঢাকার মসজিদগুলো এই শহরের আধ্যাত্মিক জীবনকে পরিচালিত করে আসছে।
প্রতিটি মসজিদ একেকটি ইতিহাস, একেকটি নিদর্শন।
এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বলতে পারে—
“ঢাকা সত্যিই মসজিদের শহর।”







